Wednesday, 17 June 2015

মাযহাব পালন : দুর্বল হাদীসে আমল করা, অথচ একই বিষয়ে প্রাপ্ত বিশুদ্ধ হাদীসটি আমলে না আনা- এমন অদ্ভুত, অযৌক্তিক আমলের নির্দেশ কি মাযহাবের ইমামগণ আমাদের দিয়েছেন ?


মাযহাব পালনের ক্ষেত্রে মাযহাবের ইমামগণের কিছু মূলনীতি ও উপদেশ রয়েছে, তা আমরা অনেকেই জানি না । বিশেষ করে মতবিরোধপূর্ণ মাস’আলাগুলোতে তথ্যসূত্র দুর্বল হলেও নিজ নিজ মাযহাবের রায় অন্ধভাবে মেনে চলি অনেকেই ।
এমন অনুসরণের অনুমতি কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দিয়েছেন ? কোন বিষয়ে দুর্বল হাদীসে আমল করা, অথচ একই বিষয়ে প্রাপ্ত বিশুদ্ধ হাদীসটি আমলে না আনা- এমন অদ্ভুত, অযৌক্তিক আমলের নির্দেশ কি মাযহাবের ইমামগণ আমাদের দিয়েছেন ?
এ বিষয়ে তাঁরা আমাদের কি উপদেশ দিয়েছেন, এতদসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণী নিম্নে তুলে ধরা হলো,
• ১ ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘হাদীস যেটা সহীহ, সেটাই আমার মাযহাব’ । (রাদ্দুল মুখতার ১/১৫৪; মুকাদ্দিমাতু উমদাতুর রিয়ায়াহ ১/১৪; হাশিয়াতু ইবনু আবেদীন ১/৬৩)
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার কোন সিদ্ধান্ত যদি রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশের বিপরীত হয়, তখন আমরা কী করব ? ইমাম সাহেব বললেন, রাসুল (সাঃ) এর হাদিসের মুকাবিলায় আমার উক্তি ফেলে দিও ।
আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনার কথা যদি সাহাবাদের উক্তির প্রতিকুল হয় তখন কী করতে হবে ? ইমাম সাহেব বললেন, সাহাবাগণের উক্তির মুকাবিলায় আমার উক্তি প্রত্যাখ্যান করো । (ইরশাদ ২৬ পৃঃ; ইকদুল জীদ ৫৪ পৃঃ)
ইমাম সাহেব তার অন্ধ ভক্তদের লক্ষ্য করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেনঃ
“সাবধান! আল্লাহর দীনে নিজের অভিমত প্রয়োগ করে কথা বলো না । সকল অবস্থাতেই সুন্নাতের অনুসরণ করে চলবে । যে ব্যক্তি সুন্নাতের নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করবে-সে বিপথগামী হবে” (মীযানে কুব্‌রা ১ম খন্ড ৯ পৃঃ)
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে হাদিসের মুকাবিলায় রায় ও কিয়াসের কানাকড়িও মূল্য নেই । তিনি বলেছেন, “বিদ্বানদের ব্যক্তিগত অভিমত অপেক্ষা আমার কাছে দুর্বল হাদীসও অধিকতর প্রিয়” । (রদ্দুল মুহ্‌তার ১ম খন্ড ৫১ পৃঃ)
তিনি আরো বলেন- “মানুষ ততদিন পর্যন্ত সত্যপথে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে হাদিসের অনুসন্ধানের অনুরাগ বিদ্যমান থাকবে । কিন্তু তারা যখন হাদিস পরিত্যাগ করে অন্য কিছুর সন্ধান করবে তখনই তারা বিপথগামী হবে” । (মীযান মিসরে মুদ্রিত ৪৯ পৃঃ)
• ২ ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আমি নিছক একজন মানুষ । ভুল করি, শুদ্ধও করি । তাই আমার মতামতকে যাচাই করে দেখে নিও । কুর’আন ও সুন্নাহর সাথে যতটুকু মিলে সেটুকু গ্রহণ করো, আর গড়মিল পেলে সেটুকু বাদ দিয়ে দিও’ । (ইকাযুল হিমাম, পৃঃ ১০২; কওলুল মুফীদ ১৭ পৃঃ)
ইমাম মালিক (রহঃ) এর মৃত্যু শয্যায় তার অন্যতম ছাত্র আব্দুল্লাহ বিন মুসলিমা কা’নাবী তাকে দেখতে যান । সালামের পর তিনি তার শয্যাপার্শ্বে আসন গ্রহন করে দেখতে পান, ইমাম সাহেব কাঁদছেন । কা’নাবী বলেন, আমি আরয করলাম, আপনি কিসের জন্য ক্রন্দন করছেন ?
ইমাম সাহেব উত্তরে বললেন, কেন কাঁদব না ? আমি যদি না কাঁদি, তাহলে কাঁদবে কে ? আল্লাহর কসম! আমি আমার ব্যক্তিগত রায় অনুসারে নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা মতে যতগুলো ফাতাওয়া দিয়েছি তার প্রত্যেকটির বদলে যদি আমি একটি করে কোড়ার আঘাত খেতাম তাই ছিল আমার পক্ষে উত্তম । তাতে আমার মুক্তির পথ প্রশস্ত হ’ত । হায়! যদি আমার রায়-মত আমি ফাতাওয়া না দিতাম! (ইবনে খাল্লিকান ১ম খন্ড ৪৩৯ পৃঃ)
• ৩ ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা আমার কোনো কথা হাদীসের সাথে গড়মিল দেখতে পাও, তাহলে তোমরা হাদীস অনুযায়ী আমল করো, আমার নিজের উক্তিকে দেয়ালে ছুড়ে ফেল’ । (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; ১/৩৫৭)
তিনি (রহঃ) বলেছেনঃ রাসুল (সাঃ) ব্যতিত আর কারোর কথাই দলিল নয়-তাদের সংখ্যা অধিক হলেও নয় । কিয়াস অথবা অন্য কোন বিষয়েও নয় । (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১৬৩ পৃঃ)
তিনি (রহঃ) বলেছেন, তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে স্বয়ং বিবেচনা করে দেখো । কারন শধু তাকলিদ অর্থাৎ অন্ধ অনুসরণ দূষণীয় ব্যাপার । (মিনহাজুল মুবিন-আমাল বিল হাদিস ৮৩ পৃঃ)
তিনি (রহঃ) স্পষ্ট করেই বলেছেন, “আমার কোন উক্তি যদি রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশের প্রতিকুল দেখতে পাও, তাহলে রাসুল (সাঃ) এর হাদিসই অনুসরণ করবে, তোমরা আমার তাকলিদ করবে না” । (ইকদুল জীদ ৮১ পৃঃ)
একদা তিনি (রহঃ) স্বীয় এক ছাত্রকে বললেন, “হে আবু ইসহাক! আমার প্রত্যেকটি কথার তাকলিদ করো না-আমি যা বলি অন্ধভাবে তার অনুসরন না করে বিচার করে দেখবে । কারণ এ হচ্ছে দীনের ব্যাপার” (মীযানুল কুব্‌রা ১ম খন্ড ৬৩ পৃঃ)
রুবাই’আ বিন সুলাইমান বলেছেন, একদা এক ব্যক্তি ইমাম শাফি’ঈ (রহঃ) কে একটা মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন । উত্তরে ইমাম শাফি’ঈ (রহঃ) বললেন, এ সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশ হচ্ছে এই ।
জিজ্ঞাসাকারী পুনরায় বললেন, আপনার ফাতাওয়াও কি তাই ?
ইমাম শাফি’ঈ (রহঃ) তার কথা শুনে চমকে উঠলেন, তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে উঠল । মনে হ’ল যে তার রক্ত শুকিয়ে গেছে । ইমাম সাহেব বলে উঠলেন, ওরে হতভাগা! আমি রাসুল (সাঃ) এর হাদিস বর্ণনা করে যদি সেই মতে ফাতাওয়া না দেই-তাহলে কোন মাটি আমার ভার বহন করবে ? আর কোন আকাশ আমাকে ঢেকে রাখবে ?
রাসুল (সাঃ) এর হাদিস আমার মস্তক ও চক্ষুর উপর স্থাপিত । আর তাঁর হাদিসই আমার মাযহাব । (ইকাযুল হিম ১০০ পৃঃ)
আর এক সময়ে ইমাম শাফি’ঈ (রহঃ) কে হাদিস বর্ণনার পর জিজ্ঞাসাকারী প্রশ্ন করে-এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী ?
ইমাম শাফি’ঈ (রহঃ) বললেন, তুমি কি আমার কোমরে পৈতা দেখেছ ? তুমি কি আমাকে কোন গীর্জা থেকে বের হয়ে আসতে দেখেছ ? আমি বলছি, রাসুল (সাঃ) এরূপ বলেছেন আর তুমি জিজ্ঞেস করছ-এ বিষয়ে আমার অভিমত কী ?
তুমি কি মনে করছ আমি রাসুল (সাঃ) এর হাদিস রিওয়ায়াত করব আর আমার অভিমত হবে তার প্রতিকুল ? (ইকাযুল হিম ১০৪ পৃঃ)
তিনি (রহঃ) বলেন-তোমরা আমার গ্রন্থে যদি কোন কথা রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাতের প্রতিকুল দেখতে পাও, তাহলে রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাত অনুসারে ব্যবস্থা দিও, আমার উক্তি ছেড়ে দিও । (ইকাযুল হিম ১০০ পৃঃ)
যেসব মাসআলায় রাসুল (সাঃ) এর সহিহ হাদিসের সমর্থন মিলবে তাই লিপিবদ্ধ করা সিদ্ধ । সহিহ হাদিসের পরিপন্থী আমার সমুদয় উক্তিকে আমি আমার জীবিতকালে এবং মৃত্যুর পরও প্রত্যাহার করে নিচ্ছি (ইকাযুল হিম ১০৪ পৃঃ)
• ৪ ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘তুমি আমার মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ করো না । মালেক, শাফেয়ী, আওযায়ী, সাওরী-তাঁদেরও না; বরং তাঁরা যেখান থেকে (সমাধান) নিয়েছেন তুমিও সেখান থেকেই নাও’ । (ইবনুল কাইয়িম রচিত ‘ঈলামুল মুওয়াক্কেয়িন; ২/৩০২)
তিনি (রহঃ) আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহীহ হাদীসকে প্রত্যাখান করবে, সে লোক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত’ । (ইবনুল জাওযী রচিত, আল মানাকির; ১৮২)
তিনি (রহঃ) বলেন- “আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) এর উপর কারও কোন কথা বলার কোনই অধিকার নেই । (মীযান ১ম খন্ড ৫১ পৃঃ)
• ৫ আল্লামা ইবনে আবেদীন বলেন, ‘কোনো মাস’আলা সহীহ হাদীসের সাথে গড়মিল হলে ঐ হাদীসটিই আমল করবে । আর ঐ হাদীসই হবে তার মাযহাব । এরুপ আমল তাকে মাযহাব থেকে বের করে দেবে না । হানাফী হলে সে হানাফীই থেকে যাবে’ (রাদ্দুল মুখতার; ১/১৫৪)
• ৬ সুনানে আবি দাউদ গ্রন্থের সংকলক মুহাদ্দিস আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘এমন কোনো লোক নেই, যার সব কথাই গ্রহণযোগ্য; কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া’ (মাসাইলে ইমাম আহমদ; ২৭৬)
আল্লাহ বলেন, “রাসুলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মতো গণ্য করো না; তোমাদের মধ্যে যারা অলক্ষ্যে সরে পড়ে আল্লাহ তো তাদেরকে জানেন । সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি” (সুরা নূর আয়াত ৬৩)
“যারা (সব) কথা শুনে, অতঃপর উত্তমগুলো আমল করে, তারাই হলো হেদায়াতপ্রাপ্ত, আর তারাই হলো বুদ্ধিমান’’ । (সূরা আয যুমারঃ আয়াত ১৮)
“জাযাকাল্লাহু খায়রান । আমীণ”
Like · 
  • 2 people like this.
  • Akhtaruzzaman Akhtar লাভ নেই কোন লাভ নেই কিয়াস ছাড়া হানাফীদের কোন পথ নেই। তারা অন্ধের মত বলে আর ধন্ধের মত চলে। তাই মানে তাদের হুজুরেরা যা বলে.

No comments:

Post a Comment